বগালেক | Boga Lake 12/04/2021




Photo Credit :- Mujahid Sagar

 

প্রকৃতির সাথে ছুটি কাটাতে চান? সে ক্ষেত্রে আপনার লোকেশন অবশ্যই বগালেকের দিকেই থাকতে হবে। বান্দরবানের পাহাড় উপত্যকায় অবস্থিত, বগালেকটি আপনার মনকে অদৃশ্য এবং হ্যালুসিনেটরি সৌন্দর্যে সতেজ করে শান্ত করার জন্য রয়েছে। এই জায়গাটি বাংলাদেশের প্রকৃতি-নির্মিত সাইটগুলির মধ্যে একটি। আপনি যদি বগালেকটি কখনও না দেখেন, তবে কখনোই বুঝবেন না যে আমরা কেন এটিকে ‘হ্যালুসিন্টরিটরি’ বলেছি।

 

এই বান্দরবানের এক রহস্যময় ও আকর্ষণীয় পর্যটন স্থান হচ্ছে বগালেক। রহস্যময় বলছি এই কারণে যে, বগালেকের উৎপত্তি নিয়ে আছে নানারকম উপকথা, যা সেখানে গেলেই শুনতে পারবেন আদিবাসীদের মুখে মুখে। প্রকৃতি তার আপন খেয়ালে এখানে পাহাড়ের উপর জলরাশি সঞ্চার করে তৈরি করেছে বগালেক বা বগা কানাই হ্রদ, যা বান্দরবান শহর থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে রুমা উপজেলার কেওক্রাডং পাহাড়ের কোল ঘেঁষে অবস্থিত। সমুদ্র সমতল হতে প্রায় ১৭০০ ফিট উপরে পাহাড় চূড়ায় ১৫ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত এই অত্যাশ্চর্য হ্রদটি। এই হ্রদটি তিনদিক থেকে পর্বতশৃঙ্গ দ্বারা বেষ্টিত। বগালেকের গড় গভীরতা আনুমানিক ১৫০ ফুটের মত। এটি সম্পূর্ণ আবদ্ধ একটি হ্রদ। অদ্ভুত সুন্দর এই স্বচ্ছ পানির লেকের পাশের গ্রামটি হচ্ছে স্থানীয় বম সম্প্রদায়ের বগামুখপাড়া। ভূ-তত্ত্ববিদগনের মতে, মৃত কোন আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ  অথবা উল্কাপিণ্ডের পতনের ফলে এই লেক তৈরি হয়েছে। বগালেক অনেকের কাছে ড্রাগন লেক বলে পরিচিত। এর সৃষ্টি যতটা না অবশ্বাস্য, যতটা না অলৈাকিক তার চাইতেও বেশী এর সৌন্দর্য। শান্তজলের হ্রদ আকাশের কাছ থেকে একমুঠো নীল নিয়ে নিজেও ধারণ করে নিয়েছে সেই বর্ণীল রং। পাহাড়ের চূড়ায় নীল জলের আস্তর নীল আকাশের সাথে মিশে তৈরি করেছে এক প্রাকৃতিক কোলাজ। মুগ্ধ হয়ে দেখবেন আকাশ, পাহাড় আর জলের মিতালী। প্রকৃতি এখানে ঢেলে দিয়েছে একরাশ সবুজের ছোঁয়া। যেন তুলির আঁচড়ে বগালেকের পুরো জায়গা সেজেছে ক্যানভাসের রঙে আর প্রকৃতি তার আপন খেয়ালে এঁকেছে জলছবি।

 

বগালেকের আশেপাশে কোন পানির উৎস খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে বগালেক যে উচ্চতায় অবস্থিত তা থেকে ১৫৩ মিটার নিচে একটি ছোট ঝর্ণার উৎস আছে যা বগাছড়া (জ্বালা-মুখ) নামে পরিচিত। সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হচ্ছে এই লেকের পানি প্রতিবছর এপ্রিল থেকে মে মাসে ঘোলাটে হয়ে যায়। কারণ হিসেবে মনে করা হয়, লেকের তলদেশে একটি উষ্ণ প্রসবন রয়েছে। এই প্রসবন থেকে পানি বের হওয়ার সময় বগা লেকের পানির রঙ বদলে যায়। প্রচুর মাছে ভরা এই লেক। জলজ লতাপাতা আর খারা পাথরের পাড়ের জন্য চমৎকার তাপমাত্রার এই পানিতে সাঁতার কাটার সময় সর্তকতা অবলম্বন করবেন।

 

কিভাবে যাবেন?

বান্দরবান শহর থেকে বগালেক যেতে হবে প্রথমে যেতে হবে রুমা বাজার। বান্দরবান থেকে রুমা বাজারের দূরত্ব ৪৮ কিলোমিটার। লোকাল বাস কিংবা চাঁন্দের গাড়ি/জীপে করে রুমা বাজার যাওয়া যায়। বাসে যেতে হলে বান্দরবানের রুমা বাস স্ট্যান্ডে যেতে হবে। সেখান থেকে ১ ঘণ্টা পর পর বাস রুমার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। দলগত ভাবে গেলে রুমা বাজার যেতে পারেন জীপ/চাঁন্দের গাড়িতে করে। এক গাড়িতে ১০-১৫ জন যাওয়া যায়। বান্দরবান শহরের জীপ স্টেশন ৩০০০-৪০০০ টাকা ভাড়ায় গাড়ি নিতে হবে। জীপে করে গেলে সময় লাগবে ২ ঘণ্টার মত।

রুমা বাজার পৌঁছে বগালেক যাবার জন্যে আপনাকে গাইড ঠিক করে নিতে হবে। গাইড নেয়া বাধ্যতামূলক। রেজিস্টার্ড গাইড আছে এমন কাউকে ঠিক করে নিতে হবে। রওনা হবার আগে রুমা বাজার আর্মি ক্যাম্প থেকে বগালেক যাবার অনুমতি নিতে হবে। এই কাজ গুলো করার জন্যে গাইড আপনাকে সাহায্য করবে। আর অবশ্যই মনে রাখবেন বিকেল ৪ টার পর রুমা বাজার আর্মি ক্যাম্প থেকে বগালেক যাবার অনুমতি কিছুতেই মিলবেনা। রুমা বাজার থেকে নতুন করে জিপ/চাঁন্দের গাড়ি রিজার্ভ করে যেতে হবে কমলাবাজার পর্যন্ত। তবে বর্ষাকালে প্রায়ই ভূমিধ্বসের কারণে ১১ মাইল নামক জায়গা পর্যন্ত আগানো যায় বড়জোর। তবে শুকনো মৌসুমে চাঁন্দের গাড়ি বগালেক অবধি পৌঁছায়। রুমা বাজার থেকে ১১ মাইল কিংবা কমলাবাজার পর্যন্ত রাস্তা আপনাকে ফ্রিতে রোলার কোস্টারে চড়ার স্বাদ দিবে নিশ্চিত। কমলাবাজারের পাশ থেকেই খাড়া পাহাড় উঠে গেছে আকাশপানে, এটির চূড়াতেই বগালেক। কমলাবাজার থেকে ২০-৩০ মিনিট পাহাড় বেয়ে উপরে উঠে গেলেই বগালেক ধরা দিবে আপনার দৃষ্টিসীমায়। আর গাড়ি যদি ১১ মাইল পর্যন্ত যায়, সেখান থেকে হেঁটে আগে পৌঁছতে হবে কমলাবাজার, এক্ষেত্রে ট্রেকিং এ সময় লাগবে দেড়-দু ঘণ্টা।

আর যদি এডভেঞ্চারের স্বাদ নিতে চান তবে রুমাবাজার হতে একটি ঝিরিপথ ধরে হেঁটে যেতে হবে বগালেক অবধি। এই পথটি দীর্ঘ আর কষ্টের কিন্তু পাহাড়ি খাল আর ঝিরিপথের রূপ বলে বোঝানোর মত নয়। যারা শারীরিক ও মানসিকভাবে শক্ত এবং রোমাঞ্চকর যাত্রার অনুভূতি পেতে চান কেবল তারাই এই পথে যাবার চিন্তা করবেন। তবে বৃষ্টির মৌসুমে ঝিরিপথ এড়িয়ে চলাই ভাল, ফ্ল্যাশ ফ্লাড কিংবা হড়কা বানের সম্মুখীন হবার ভয় থাকে।

রুমাবাজার থেকে বগালেক (১১ মাইল কিংবা কমলাবাজার) পর্যন্ত চাঁন্দের গাড়ির ভাড়া কমবেশি ২০০০ টাকা। তবে পর্যটন মৌসুমে তা ৪০০০ থেকে ৫০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। আর গাইডকে প্রতিদিনের জন্য দিতে হবে ৩০০-৫০০ টাকা।

 

কোথায় থাকবেন?

বগালেকে উন্নতমানের কোন হোটেল বা রিসোর্ট নেই। আদিবাসীদের ছোট ছোট কিছু কটেজ আছে। আপনাকে সেই সব কটেজের কোন একটায় থাকতে হবে। একেবারে প্রাকৃতিক পরিবেশে আদিবাসীদের এই কটেজ গুলোতে থাকতে জনপ্রতি খরচ হবে ১০০-২০০ টাকা করে। এক রুমের কটেজে ৫-৬ জন থাকা যাবে। এছাড়া কাপল কিংবা মহিলাদের জন্য চাইলে আলাদা কটেজের ব্যবস্থা করা যায়।

খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা আদিবাসী ঘরেই করতে হবে। সাধারণত ১০০-২০০ টাকার খাবার প্যাকেজ পাওয়া যায়। কটেজ গুলোতে আছে বারবিকিউ করার ব্যবস্থা, পাহাড়ি মুরগি কিনে লেকের পাড়ে বসে উপভোগ করতে পারেন ভিন্ন পরিবেশের এই আয়োজন।